"হীরা" নিয়ে কিছু কথা

feature image

রূপালি চাঁদের আভা কিংবা অন্ধকার আকাশের লক্ষ-নিযুত তারাদের চকমকি দেখে মানুষ চমকিত হয়েছে চিরকাল। কিন্তু সেই চমকিত চাঁদের আলো অঙ্গে জড়ানো যায়নি কখনো কিন্তু আকাশ থেকে একটি তারাকে তুলে এনেও সাজানো যায়নি গলার অলংকার হিসেবে। সৌন্দর্য্য পিপাসু মানুষদের প্রথম  অলংকার ছিলো তাই সামুদ্রিক ঝিনুক হাড় কাঠ, শামুক আর বিভিন্নরকমের অনুজ্বল পাথরের টুকরো।

ধারণা করা হয় ব্রোঞ্জ যুদের শুরুতে ভারতবর্ষের দ্রাবিররা খৃষ্টের জনমের অন্তত দুই হাজার বছর আগে এমন এক উজ্জ্বল রত্নপাথর খুঁজে পেয়েছিলো যা মানুষের অঙ্গে নিয়ে এসেছিলো পূর্ণ চাঁদের আভা। যা এখনো পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান রত্ন পাথর হিসেবে বিবেচিত এবং আমরা যাকে চিনি ডায়মন্ড বা হীরা নামে। একটা সময় পর্যন্ত পৃথীবীর মানুষ ভাবতো এই মহামূল্যবান পাথর বুঝি শুধুমাত্র ভূভারতেই পাওয়া যায়। তৎকালীন সিল্করুট ধরেই এই রত্নপাথর পৌঁছে গিয়েছিলো ভারতবর্ষ থেকে প্রাচীন গ্রীস এবং রোমে। প্রাচীন গ্রীকরা এই রত্ন পাথরের নাম রেখেছিলো "এডাভাস"।

যার অর্থ অজেয়, অবিনাশী অথবা অপ্রতিরোধ্য। পারস্যের বিখ্যাত কবি হাফিজ বলেছিলেন, আকাশের রামধনু চিরকাল একটা ছোট্ট হীরার মধ্যে আবদ্ধ থাকে। হীরার ঔজ্বল্য এতোটাই যে, প্রথম যুগে হীরাকে আরাধ্য বস্তু বলে মনে করা হতো। তাই আবিষ্কারের দীর্ঘকাল অতিবাহিত হওয়ার পর হীরাকে অলংকার হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে মানুষ। প্রাচীনকালে হীরকখন্ডকে দেবতাদের কাছ থেকে পাওয়া দান বলে মনে করা হতো।

প্রাচীন ভারতের দেবতাদের চোখে হীরাকে স্থাপন করা হতো তাদের সূক্ষ এবং নিরপেক্ষ দৃষ্টিশক্তির প্রতীক হিসেবে। বৌদ্ধ ধর্মে বুদ্ধের সিংহাসন বর্জ্রাসনেও ছিলো হীরার উপস্থিতি। কারণ মূল্যবান এই পাথরটিকে জ্ঞান, পরিপূর্ণতা এবং স্বচ্ছতার প্রতীক হিসেবে মনে  করা হয়। প্রাচীন গ্রীকরা হীরাকে তাদের দেবতাদের অশ্রু হিসেবে বিবেচনা করতো। গ্রীসের যোদ্ধারা সেসময় হীরা পড়তেন কারণ তারা মনে করতেন এই রত্ন পাথর তাদের পেশীকে আরো শক্তিশাওলী ও দৃঢ় করে তুলবে। প্রাচীন রোমানরা মনে করতো হীরা পৃথিবীর বাইরের কোনো তারার বলয় থেকে ছিটকে পৃথিবীতে এসে পড়েছিলো।

দেবতাদের চোখে কিংবা বাদশাহর মাথার মুকুটে কিংবা চিরন্তন প্রেমে আবদ্ধ যুবক যুবতীর আংটিতে অথবা নেকলেসে ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে যেভাবেই হোক হীরার অবস্থান ছিলো সবসময়ই জৌলুসের।

ইতিহাসবিদদের মতে খৃষ্টপূর্ব আড়াই হাজার থেকে সতেরোশত অব্দের মাঝামাঝি  কোনো এক সময়ে সিন্ধু সভ্যতার ব্রোঞ্জ যুগে দ্রাবিড় জাতি সর্বপ্রথম হিরার সন্ধান পায়। আবার অনেকের মতে ভারতে সর্ব প্রথম হীরা আবিষ্কার করা হয় খৃষ্টপূর্ব এক হাজার অব্দের কাছাকাছি সময়ে। তবে খৃষ্টপূর্ব চারশো অব্দের দিকে প্রাচীন ভারতের সংস্কৃত ভাষায় লিখিত গ্রন্থ, অর্থশাস্ত্র এবং রত্নপরীক্ষাতে সর্বপ্রথম হীরার লিপিবদ্ধ বিবরণ পাওয়া যায়।

সংস্কৃত ভাষায় এই মণিকে বর্জ্যমণি বা অন্দ্রমণি বলা হয়। প্রাচীন সেই গ্রন্থে মুদ্রা হিসেবে হীরার বিনিময় প্রথার বিষয়টি উল্লেখ ছিলো। বাণিজ্য মাধ্যম হিসেবে হীরা ব্যবহারের কারণে ভারত ও চীন হয়ে ইউরোপের সাথে যুক্ত প্রাচীন বাণিজ্যিক পথ সিল্করুট ধরে মূল্যবান এই পাথরটি পৌঁছে যায় রোমান সাম্রাজ্য পর্যন্ত। পরবর্তী কয়েকশতকে মূল্যবান এই রত্নপাথরটি গ্রীস এবং রোমের রাজ পরিবার ও প্রভাবশালীদের কাছে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে জায়গা করে নেয়।

তেরো শতকে ইউরপীয়রা প্রথম হীরা দিয়ে নিজেদের সাজাতে শুরু করে। ইউরোপীয় রেঁন্সার সময়কাল থেকে হীরা বাগদানের আংটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। ১৪৭৭ সালে আর্চডিউক ম্যাক্সিমিলিয়ন ম্যারি অব মার্গান্টিকে বাগদানের সময় একটি হীরার আংটি উপহার দিয়েছিলেন। হীরক বা হীরা কার্বনের একটি শুদ্ধতম ও গাঢ়তম রূপ। কার্বনের বহু রূপকের মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান পদার্থ হলো হীরা। এর আলোক প্রতিসরণ ক্ষমতা সর্বাধিক বলে একে উজ্জ্বল দেখায়। এটি তাপ ও বিদ্যুৎ অপরিবাহী এবং পানি এসিড ও ক্ষারকে অদ্রবণীয়। সাধারণ তাপমাত্রায় হীরককে কোনো জারকই জারিত করতে পারেনা।

মূলত অত্যাধিক তাপ, চাপ ও একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে থাকার কারণে কার্বন থেকেই হীরা তৈরী হয়। বেশিরভাগ প্রাকৃতিক হীরাই পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে ১০০ মাইলেরও বেশি গভীরে ১০০০ ডিগ্রী  সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা ও ৪৫-৯০ কিলোবার চাপে কার্বন পরমাণু থেকে হীরায় রূপান্তরিত হয়। হীরা রূপান্তর প্রক্রিয়ায় সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। প্রাকৃতিকভাব একার্বন হীরায় রূপ নিতে প্রায় এক বিলিয়ন থেকে সাড়ে তিন বিলিয়ন পর্যন্ত সময় লেগে যায়। আজ পর্যন্ত পাওয়া প্রায় সব হীরার বয়সই  পৃথিবী সৃষ্টির প্রথম দিককার উদ্ভিদগুলোর চেয়েও বেশি। বিজ্ঞানীদের ধারণা, পৃথিবী গঠণ হবার সময়েই এর অভ্যন্তরে আটকে পরা কার্বন উচ্চতাপ ও চাপে ধীরে ধীরে হীরায় পরিণত হয়েছে। গবেষকদের মতে  সকল হীরাই পৃথিবীতে তৈরী হয়েছে এমন নয়।

পৃথিবীতে এমন অনেক হীরা পাওয়া গেছে যেগুলো পৃথিবীর বাইরে তৈরী। হীরা পরিমাপের একক ক্যারেট। হীরার পরিমাণে এক ক্যারট  মানে ০.০২ গ্রাম। ক্ষণিতে প্রাপ্ত হীরক খন্ড কেটে বিভিন্ন তল ও কোণের সংখ্যা বৃদ্ধি করে এর উজ্জ্বলতা আর বৃধি করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রকৃতিতে ত্রুটিহীন হীরা পাওয়া খুবই বিরল। প্রকৃতিতে প্রাপ্ত একেকটি হীরার আকার, আয়তন, বর্ণ ও স্বচ্ছতায় ভিন্নতা থাকে। তাই নির্দিষ্ট কোনো দামের গন্ডিতে ফেলা সম্ভব নয়। অনেকের ধাওরণা যে হীরার আকার ও আয়তন যত বড় সে হীরার দাম তত বেশি। কিন্তু এ ধারণা ভুল। গ্রেডিং সিস্টেমের উপর ভিত্তি করে হীরাকে মোট ১১টি গ্রেডে ভাগ করা হয়েছে। এদের মধ্যে আই এফ বা এফ গ্রেডের হীরাকে ধরা হয় নিখুত  হিসেবে। এসব হীরার মদ্যে কোনোরকম অপদ্রব্য থাকেনা।

পুরোটাই খাটি কার্বন পরমাণুর স্বচ্ছ স্ফটিক। হীরার দাম নির্ধারণে বর্ণ বা রঙ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হীরার কালার গ্রেডিং শুরু হয় ডি থেকে যা শেষ হয় জি এ। শ্বেত হীরার ক্ষেত্রে হীরাতে ইংরেজি বর্ণমালার ক্রমানুসারে ডি থেকে যত সামনের দিকে এগোবে, হলুদ রঙের উপস্থিতি যত বাড়বে , হীরার দামও তত কমবে। তবে হোয়াইট ডায়মন্ড বা শ্বেত হীরা ছাড়াও বেশ কিছু হীরা প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হয় যেগুলোর কালার গ্রেডিং ভিন্নভাবে করা হয় এবং সেগুলোর দামও বর্ণভেদে হয়ে থাকে ভিন্ন। এছাড়াও হীরার দামে যেটি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে তা হচ্ছে কাটিং আর পলিশিং। জুয়েলারিতে ব্যবহার করার মতো আকার আনতে হলে সে হীরার অধিকাংশই বাদ দিতে হয় যা হীরার দাম বৃদ্ধিতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

সারাবিশ্বের সমস্ত মহাদেশেই হীরা পাওয়া যায়। ভারতবর্ষে হীরা আবিষ্কারের পরে প্রায় ৬০০ খ্রিষ্টাব্দে অষ্ট্রেলিয়ার উত্তরে অবস্থিত বর্ণিও দ্বীপে হীরার খনি পাওয়া যায়। ১৭২৫ সালে ব্রাজিলে হীরার একটি খনি পাওয়া গেলেও তা তৎকালীন বিশ্বের হীরার চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত যোগান দিতে পারতোনা। ক্রমবর্ধমান হীরার চাহিদা মেটাতে সেসময় থেকেই হীরার ব্যাপক অনুসন্ধান শুরু হয়। তার এই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী শতকে রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় বেশ কিছু হীরার খনি আবিষ্কৃত হয়। তবে হীরার জগতের চিরচেনা চেহারা পাল্টে যায় ১৮৬৬ সালের সক্ষিণ আফ্রিকার অরেঞ্জ নদীর পাশে বেশ কয়েকটি হীরার খনি আবিষ্কারের পর।

এখন দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়াও আফ্রিকা মহাদেশের বেশ কিছু অঞ্চলে হীরা পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে উন্নত যন্ত্রপাতি না থাকাতে ডায়মন্ড মাইনিং প্রক্রিয়া চলতো মাটির অল্প গভীর পর্যন্ত। প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে সাথে বরতমানে হীরার মাইনিং মাটির নিচে ৫০০ থেকে ৬০০ মিটার পর্যন্ত করা হয়। হীরার মাইনিং একদিকে যেমন সময় সাপেক্ষ অন্যদিকে কষ্ট সাধ্য ও ব্যয়বহুল। পৃথিবীতে প্রাপ্ত আজ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় হীরার নাম হচ্ছে "কুলিনান"।

৩১০৬ ক্যারটের এই হীরাটির ওজন ৬২১ গ্রাম। "কুলিনান" হিড়াটি ১৯০৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাওয়া গিয়েছিলো। ট্রান্সভাল সরকার সেসময় এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার পাউন্ড দিয়ে সেটি কিনে নেয় এবং রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডকে উপহার দেয়। রাজা "কুলিনান"কে কেটে খন্ড খন্ড করেন। এই খন্ডগুলোর কয়েকটিকে ব্রিটিশ রাজমুকুটে স্থাপন করা হয়।

Comments

You must be logged in to post a comment.

লেখক সম্পর্কেঃ

I am a 2nd year honors student in Mathematics at Jagannath University