বইমেলায় কুড়ীয়ে পাওয়া দুটি শিক্ষা

দেখতে দেখতে প্রাণের বইমেলা শেষ হয়ে গেল। করোনার কারনে দেরিতে শুরু হয়ে আবার দেরিতেও শেষ হল। প্রিয় জিনিস যখন কাউকে ছেড়ে চলে যায় তখন এর থেকে কষ্টের কিছু হতে পারে না। আমি প্রথম বইমেলাতে যাই সেই ২০০৩ সালে। সেই বইমেলায়, বলা যায় আমি দুটি শিক্ষা কুড়ীয়ে পেয়েছিলাম। যে শিক্ষাগুলো আমি আমার জীবনে মনেপ্রানে মেনে চলি। ভাবলাম আপনাদের সাথে সেগুলো শেয়ার করি, হয়ত এর থেকে কেউ কেউ অনুপ্রেরণা পাবেন।

শিক্ষা-১ঃ 

ছোটবেলা থেকেই আমার রক্তদান করার খুব ইচ্ছা ছিল। পত্রপত্রিকা পড়ে জানতে পেরেছিলাম বয়স ১৯ হলেই রক্ত দেয়া যায়। কিন্তু কিভাবে কি করতে হবে জানা ছিল না। কেউ কখনো রক্ত লাগবে বলে সাহায্যও চায়নি।

এভাবে বয়স ১৯ পেরিয়ে গেছে, কিন্তু সাহস করে কাউকে বলতে পারিনি যে আমি রক্ত দেব। ২০০৩ সালের বই মেলায় ঘুরতে ঘুরতে দেখি বাংলা একাডেমির বারান্দায় ব্লাড ডোনেশন কার্যক্রম চলছে। আমার রক্তদানের ইচ্ছার কথা মনে পড়ে গেল, আবার খুব ভয়ও লাগছিল যদি খারাপ কিছু হয়ে যায়। সাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে প্রস্তাব দিলাম এক সাথে রক্তদান করার, ভাবলাম সে হয়ত সাহস দেবে। ওমা সে দেখি সাথে সাথে নাকচ করে দিল।

যুক্তি হচ্ছে এত কষ্ট করে খেয়ে দেয়ে রক্ত তৈরি করি, ফ্রিতে রক্ত দিয়ে শরীরের বারোটা বাজাবো নাকি। এটা বলেই সে দ্রুত কেটে পড়ল। আমারও জিদ চেপে গেল। লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে, দুরু দুরু বুকে বাংলা একাডেমির বারান্দায় গিয়ে দাড়ালাম। সমস্ত সাহস এক করে, একজন ভলেন্টীয়ারকে বললাম, আমি রক্তদান করতে চাই। তিনি আমাকে পথ দেখিয়ে একজন ইয়াং ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন, বাকি কাজ খুব সহজেই হয়ে গেল।

জীবনে প্রথমবার রক্তদান করে নিজেকে হিরো মনে হচ্ছিল। সেই থেকে শুরু, আলহামদুলিল্লাহ এখন ২০২২ সাল, গত ১৯ বছর ধরে নিয়মিত চার মাস অন্তর অন্তর রক্তদান করে ছলছি (অবশ্য করোনার কারনে বেশ কিছুদিন গ্যাপ পড়ে গিয়েছিল, এখন আবার নিয়মিত)। সেদিন যদি সাহস করে শুরুটা না করতাম, তবে হয়ত আরো বেশ কয়েক বছর নষ্ট হয়ে যেত প্রথম রক্তদান করতে, হয়ত এখনো রক্তদাতার খাতায় নাম লেখানো হত না।

তাই আমি বলব, আপনি যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন সেটা নুন্যতম পরিকল্পনা করে, সাথে সাথে শুরু করে দেন। জীবনে শুরু করাটা জরুরি, আমরা শুরুটাই ঠিকমত করতে পারি না। এই শুরু করছি, শুরু করব, আর কিছুদিন যাক, একটু ভেবে দেখি, এভাবে বলতে বলতে আমাদের শুরু করাটাই হয়ে ওঠেনা। শুরু করে দেন, দেখবেন সবকিছু ইজি হয়ে যাবে। পথে নামলে পথই পথ দেখায়।   

শিক্ষা-২ঃ 

সেদিনের বইমেলায় রক্তদান করে, বাহিরে বের হয়ে, খুশিমনে আমার পলাতক বন্ধুকে খোঁজ করছি, ঠিক এমন সময় দেখি বাংলা একাডেমির বটতলার নিচের মঞ্চে, বই উদ্ভধনের ঘোষণা পাঠ হচ্ছে। লেখকেরা সবার সাথে মিলে বই উদ্ভোধন করছেন।

২০০৩ সালে এত মিডীয়া ছিল না। হাতেগোনা কিছু সাংবাদিক ছবি তুলছেন আর ইন্টারভিউ নিচ্ছেন। আরও দেখলাম অনেক লেখক তার ভক্ত পাঠকদের বইতে আটোগ্রাফ দিচ্ছেন কথা বলছেন। ছোটবেলা থেকেই আমার বই পড়া আর লেখালেখির অভ্যাস, সেই দৃশ্য দেখে আমারও খুব ইচ্ছা হল, আমিও একদিন আমার বই বের করব, আমিও আমার ভক্তদের বইতে আটগ্রাফ দেব। বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, আমি গত ১৯ বছর ধরে এই স্বপ্ন লালন করেছি।

আমার স্বপ্নের কথা কখনো ভুলে যাইনি। আমি কতটা সিরিয়াস ছিলাম তার উদাহরণ দেই, একবার আমি হাতে লিখে নিজের বই নিজে বের করেছিলাম। লেখক, প্রকাশক, পাঠক সবই আমি। বিয়ের পরে আমার স্ত্রিকেও একইভাবে হাতেলেখা বই উপহার দিয়েছিলাম। শুধু তাই না, নিজের লেখার মান যাচাই করার জন্য, ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ক লেখালেখির পাশাপাশি, বাংলাদেশের লেখালেখির বড় বড় ফেসবুক গ্রুপগুলোতে আমি নিয়মিত গল্প পোষ্ট করে গিয়েছি।

যেখানে আমার সামান্য ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ক একটা পোষ্টে আপনারা হাজারের উপর লাইক দেন। সেই আমার কোন গল্প তাদের কোন গ্রুপেই কখনোই পাবলিশ হয়নি, কেন হয়নি সেটাও তারা কখনো বলেনি। বার বার গল্প পোষ্ট করাতে, একটা বড় গ্রুপ থেকে সম্ভবত ব্যানও করা হয়েছিল। এসব নিয়ে আমি মন খারাপ করিনি, কারন আমার লেখা হয়ত মানসম্মত ছিল না। তাই চেস্টা করে গিয়েছি লেখার মান আরও উন্নতি করতে। আমার এই আত্মবিশ্বাসটুকু ছিল যে, আমার স্বপ্ন একদিন সফল হবেই হবে ইনশাল্লাহ।

আমার স্বপ্ন দেখার ১৯ বছর পর, এই বছর মানে ২০২২ সালের বইমেলায় ঠিকই আমার বই প্রকাশিত হয়েছে। গত ১৯ বছরে আমার স্বপ্নকে আমি এক দিনের জন্যও ভুলে যাইনি। আমি ক্রমাগত চেস্টা করে গিয়েছি। আমি বিশ্বাস করেছি, যে মন থেকে চায় আর চেস্টা করে, আল্লাহ তার কাজকে সহজ করে দেন। গত ১০ই মার্চ যখন সবাই মিলে বইমেলাতে আমার বই উদ্ভধন করছিলাম, আর বইতে আটোগ্রাফ দিচ্ছিলাম, তখন আসলে আমি সেই ১৯ বছর আগে ফিরে গিয়েছিলাম। আল্লাহর দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া। 

আমি জানি আপনাদের অনেকেরই অনেক ধরনের স্বপ্ন আছে, হোক সেটা ফ্রিল্যান্সিং বা অন্য কিছু। লোকলজ্জায় হোক আর হীনমন্যতায় হোক, কাউকে বলতেও পারছেন না, বা কিছু করতেও পারছেন না। আমি বলব নিজের উপর বিশ্বাস রাখেন, আপনার স্বপনের কথা কাউকে বলার দরকার নেই, সেটা নিজের মধ্যে লালন করেন, সবর করেন আর নিরবে আপনার লক্ষ্যে কাজ করে যান। ইনশাল্লাহ আপনি সফল হবেনই হবেন। স্বপনের কথা কাউকে বলার দরকার নেই, সেটা বাস্তবায়ন করে সবাইকে দেখিয়ে দিন, যেমনটা আমি এই পোষ্টের মাধ্যমে আপনাদেরকে জানালাম।

ধন্যবাদ!    

Comments

You must be logged in to post a comment.

লেখক সম্পর্কেঃ